সুহৃদকুমার ভৌমিক : আর্য রহস্য

এই প্রবন্ধের প্রধান উদ্দেশ্য হল ভারতের প্রাচীনতম নরগোষ্ঠী কোল বা অস্ট্রো-এশিয়াটিক জাতির যে-সমস্ত জীবন্ত ভাষা রয়েছে, যেমন সাঁওতাল, মুণ্ডা, হো প্রভৃতি— সে-সমস্ত ভাষার সাহায্যে এবং আমাদের প্রচলিত ধারণাসমূহের সাহায্যে ‘আর্য’ শব্দটির ব্যাখ্যা। আজকের দিনের অধিকাংশ ভাষাবিজ্ঞানী পণ্ডিত অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছেন যে, তামাম পৃথিবীতে যে-সমস্ত সংস্কৃত শব্দের অপব্যাখ্যা হয়েছে, তাদের মধ্যে ‘আর্য’ শব্দটি হল সর্বাধিক ভাগ্যহীন। এর পশ্চাতে কাজ করেছে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সাম্রাজ্যবাদী, লোলুপ বাসনাসিক্ত পণ্ডিতদের স্বেচ্ছাকৃত ভুল ব্যাখ্যা, যাকে ঘোরতর অপরাধই বলা যায়। Prof. Winfred P. Lehmann Historical Linguistics: An Introduction বইতে (পৃ. ১৯) বলেছেন, ‘অনেক লেখক প্রাচীন Indic ও Celtic লোকেদের পরিচয় দিতে গিয়ে ‘আর্য গোষ্ঠীভুক্ত’ শব্দটি প্রায়ই ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন এই নাম আর চলে না। এর পেছনে কাজ করেছে একটা রাজনৈতিক ফন্দি (“…this name is now in dispute because of a misuse of it for devious political purpose.”)। আর এ-যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী বহুভাষাবিদ্‌ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দের ভ্রাতা) তাঁর Studies in Indian Social Polity নামে সুবিশাল গ্রন্থে (যার মূল বিষয় ৩ খণ্ডে ভারতীয় সমাজ পদ্ধতি নামক বাঙলা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে) ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা বলেছেন যে, আর্য বিষয়ক মিথ্যা ইতিহাস বা myth সৃষ্টির প্রধান কারণই হল য়ুরোপীয় জাতি ও নেশন-গুলির আগ্রাসী রাজনৈতিক আধিপত্যের অপচেষ্টা।

এই অপব্যাখ্যার জনক হলেন ফ্রিডরিশ মাক্স মূলর। এশিয়াটিক সোসাইটি-র স্রষ্টা স্যার উইলিয়ম জোনস দেখেছিলেন, সংস্কৃত ভাষা এক আশ্চর্য শক্তিশালী ভাষা, এর মূল শব্দে (root word) প্রত্যয় ও উপসর্গের ব্যবহারে বিচিত্র শব্দের জন্ম হয়, যার দৃঢ়তার কাছে য়ুরোপীয় গ্রিক, ল্যাটিন বা ইংরাজি, কেউই দাঁড়াতে পারে না। (“The Sanskrit language, whatever be its antiquity, is of a wonderful structure, more perfect than the Greek, more copious than the Latin and more exquisitely refined than either, yet bearing to both of them a stronger affinity both in the roots of verbs and in the forms of grammar, …than could possibly have been produced by accident; so strong indeed, that no philologer could examine all three without believing than to have sprung from some common source, which perhaps, no longer exists.”)।

তখন ভারতের ভাগ্যবিধাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্ভবত এই চিন্তা ছিল যে, ভারতবাসীর মনে দাস মনোভাব বা হীনতাবোধ সৃষ্টি করাই হবে স্থায়ী রাজ্যশাসনের প্রধান হাতিয়ার, তাই সংস্কৃতকে কত কম মর্যাদা দেওয়া যায় তা তারা ভেবেছিল। সৃষ্টি হয়েছিল এক কাল্পনিক ‘আর্য’ জাতি, যারা নাকি ভেড়া চরাতে-চরাতে য়ুরোপ থেকে এখানে এসে সংস্কৃত প্রভৃতি ভাষার সৃষ্টি করেছিল। এ জন্যই নাকি সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে য়ুরোপীয় ভাষাগুলির এত মিল!

আর্য বিষয়ক এই নূতন ব্যাখ্যার জন্য একমাত্র মাক্স মূলর-কেই দায়ী করা হয়ে থাকে। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মাক্স মূলর-এর যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন মেকলে। মেকলে স্বপ্ন দেখেছিলেন ভারতের সমস্ত মানুষকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার। ১৮৩৬-এর ১২ অক্টোবরের একটা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “It is my belief that if our plans of education are followed up, there will not be a single idolator among the respectable castes in Bengal thirty years hence.” (The Life and Letters of Lord Macaulay by Rt. Hon’ble Sir George Otto Trevelayan, Bart pp. 329-330 from the book Max Müller Exposed, p. 4).

সেই plans of education-এর একটি পরিকল্পনা হল আর্য জাতির আবিষ্কার। Brahma Dutt Bharati লিখিত Max Müller Exposed নামক পুস্তকে প্রকাশিত তাঁর স্ত্রীকে লেখা মাক্স মূলর-এর একটি চিঠিতে তার সামান্য আভাসও আছে— “This edition of mine and the translation of the Veda will hereafter tell to a great extent on the fate of India— it is the root of their religion and to show them what the root is, I feel sure, it is the only way of uprooting all that has sprung from it during the last three thousand years.” (1866). (‘Life and Letters of Friedrich Max Müller’ from Max Müller Exposed, p.11). অর্থাৎ, আমার অনূদিত বেদ ও তার সংস্করণ ভবিষ্যতে ভারতের ভাগ্যকে ব্যাপক ভাবে নির্ধারিত করবে। কারণ এটাই হল তাদের ধর্মের উৎস এবং তাতে রয়েছে তাদের ধর্মের মূল কী। আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছি এই হল একমাত্র পদ্ধতি যা তাদের তিন হাজার বছরের সমস্ত ধ্যানধারণাকে নির্মূল করে দেবে।

আর সত্যই কিছুদিন বাদে দেখা গেল যে আমরাই আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম ও সভ্যতার ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে দেখা শুরু করেছি। আমরা স্বীকার করে নিলাম ভারতীয় সভ্যতার গৌরব ও বৈশিষ্ট্য এক বিদেশাগত যাযাবর জাতি থেকেই এসেছে। এমনকী হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের পরও সেই ধারণা নির্মূল হল না।

(সুহৃদকুমার ভৌমিক রচিত ‘আর্য রহস্য’ পুস্তকের নামপ্রবন্ধ থেকে অংশবিশেষ)

Leave a Reply