আমি সে রকম ভিখারি নই : রামকিঙ্কর বেইজ

আপনাদের সময়ে শিল্পীদের মূল সমস্যা কী ছিল?

রামকিঙ্কর। কিছু না… কোন সমস্যাই ছিল না। আমি যদি ছবি আঁকতে পারি… তা হলে কোন সমস্যাই নেই। একটা সমস্যা ছিল যে ছবি কী ভাবে আঁকব? হ্যাঁ, আর-এক সমস্যা… নারী। তবে সে কথা বাদ দাও (অট্টহাসি)। সমস্যা মিটে গেল। সমস্যা হল উৎপাদন করো, যোগাড় করো।… সে সব বাদ দিলে সমস্যা মিটে গেল।

— আজকের সময়ে শিল্পীদের মূল সমস্যা কী?

রা। ফ্রিডম… ফ্রিডম টু ওয়র্ক। ফ্রিডম।… কাজ করার ইচ্ছা। (থেমে একটু ভাবেন)… চলে আসবে… চলে আসে।… আর জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক… আমি মানুষ দেখেছি… বামন নিয়ে কী হবে?

— আপনি বিবাহ করেননি। এ নিয়ে কিছু বলতে চান?

রা। বিয়ে করব, ঘর-সংসার করব— আমার এ ইচ্ছে কোন দিনই ছিল না।… খালি কাজ করব, এই-ই লক্ষ্য ছিল।… বিয়ে করলে তা সম্ভব হত না।… ঘর বাঁধার সুখ আমার শিল্পের কাছেই মিটে যায়।… নারী।… নারীর প্রয়োজন আছে।… পুরুষ তো প্রকৃতিরই সৃষ্টি।

— আপনার ছবি ও মূর্তি, দুই-ই অদ্ভুত ভাবে প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

রা। মানুষ তো প্রকৃতির মধ্যেই আছে।

— প্রকৃতির মধ্যে আবার গাছকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

রা। সজীব।… গাছ।… গাছ হল সজীব।

— গাছেরও আবার সব অংশ নয়, রূপের স্তরে কাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কই বেশি।

রা। কাণ্ডই আসল।… তা-ই সজীব।… পাতা তো আসবেই।… ফুল আসবে।… আসল হল শিকড়, আসল হল কাণ্ড।

— একবার পিকাসো নিজের প্রদর্শনী চলাকালীন দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রকৃতি না-থাকলে শিল্পীও থাকে না। প্রকৃতিকে পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে শিল্পী তাকে অপমানই করে।

রা। অপমান করতে পারবে না।… অপমান নয়।… অপমান করতে পারবে না। সে অনুকরণ করে না।… প্রকৃতি।… প্রকৃতি… লীলা। প্রকৃতি… মায়া।… খেলা। ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন।… এই ভাবে খেলেছেন।… আমাদের খেলতে দেবেন না কেন? আমরাও খেলব। তাঁর খেলায় একটা অনুশাসন আছে… মুক্ত অনুশাসন। খেলা… তুলিও খেলতে পারো। এই সৃষ্টিও খেলা। আমি খেলা করি… নিশ্চিন্ত হয়ে। রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আছে— ‘তোমারই নাম বলব, বলব নানান ছলে…’( গুনগুনিয়ে শুরু করে ক্রমে দরাজ গলায় গাইতে শুরু করলেন)… ‘বলব মুখের হাসি দিয়ে, বলব চোখের জলে’… আমার হাসিও তাঁর… আমার ভাবও তাঁর।… প্রকৃতি… প্রকৃতি। পিকাসো-র সংকোচ আছে, তা-ই এমন বলেছে।… ইশ্বর সৃষ্টি করেছেন… অকারণে।… শিশু জন্ম দেওয়ারও কারণ আছে।… ঈশ্বর যা সৃষ্টি করেছেন, তার থেকে আনন্দ নাও।… সংগাত নয়… লড়াই নয়… লীলা।

— কী ভাবে?

রা। কী ভাবে?… তুমি নিজে-নিজেই তার উত্তর পেয়ে যাবে। যদি আমি আনন্দ না-পেতাম, তবে কাজ করতাম না… প্রশ্ন নয়… সব ভুলে যেতে হবে।… খেলা করতে হবে। মনে কোন অসন্তোষ থাকলে বুঝব যে তুমি এখনও ভোলোনি।… জন্ম হয় ভবিষ্যতের জন্য।… এই-ই চলবে। দেখি… চিনি… তখন বোধের জন্ম হয়… আনন্দ হয়, সৃষ্টি করি… আনন্দ হয় (খানিক ক্ষণ ভাবতে-ভাবতে হারিয়ে যান)… বুদ্ধ।… বুদ্ধ।… বর্তমান… শিশুর জন্ম দেওয়া এক অর্থে পুনর্জন্ম… আমাকে ছাড়া নয়, বরং আমার মধ্যে দিয়ে। মায়া… মায়া।

— আপনার অধিকাংশ কাজ বীরভূমের সাঁওতাল আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রা। না… তা নয়। অনেক রকমই তো আছে। (থেমে ভাবলেন) হ্যাঁ, হতে পারে। ওরা শ্রমিকের দল… ওরা কাজ করে… ওদের হাত আছে… সূর্য… রৌদ্র… খোলা চুল… ঘাম।… ওদের খিদে পায়।… কষ্ট হয়… দুঃখ… দরিদ্র ওরা। (খানিক ক্ষণ চুপ করে থেকে) ওরা অনেক সক্রিয়। কর্মসক্রিয়তা ভালো লাগে আমার।… ললিত… সক্রিয় জীবন। (হাত উঠিয়ে দূরের বসতবাড়ি, অফিসবাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে) dull life… ওরা যারা বসে থাকে… কী সব লেখে… কী আছে ওদের?… থাকুক বসে।… ঐ যারা ব্যবসা করে (দূরে বাজারের দিকে ইঙ্গিত করে), ওদের সক্রিয়তা কীসের?… যেখানেই গেছি… যাদের প্রকৃত সক্রিয়তা দেখেছি… তাদের এঁকেছি। তাদের মধ্যে রূপের প্রাচুর্য আছে।

— আপনি কখনও নিজের ছবি আঁকেননি?

রা। এঁকেছি… গাঁয়ে এঁকেছি। এখান আসার আগে… ছোটবেলায়। কখনও আঁকব হয়তো।… খেয়ালের ব্যাপার।… অন্যেরা করেছে… ভালো, ভালো। (রামকিঙ্করের পোর্ট্রেট অনেকেই করেছেন)।

— তো আপনি সেল্‌ফ পোর্ট্রেট করবেন?

রা। শিল্পী যা করে, সবই তার সে‌ল্‌ফ পোর্ট্রেট।

— সৃষ্টি করার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কী?

রা। উন্মুক্ত মন।… মনের উন্মুক্ততা অবশ্য প্রয়োজন।… ফিলিং… ফিলিং।

— অনুভূতি, না অভিব্যক্তির জন্য?

রা। অভিব্যক্তি।… অভিব্যক্তির জন্যই বেশি দরকার।

— অভিব্যক্তি কীসের জন্য?

রা। নিজের জন্য, তার পর অন্যের জন্য।… রবীন্দ্রনাথ কার জন্য করেছিলেন?… সৃষ্টির জন্য।… পাগলামি থাকে… নেশা থাকে, সে-ই সৃষ্টি করে। (খানিক থেমে) না, বলতে পারি না।… রবীন্দ্রনাথ নিজের সম্পর্কে বলতেন, ‘বাতিকগ্রস্ত, মাথাখারাপ’।… আনন্দই প্রথম।

— ভেবে-বুঝে?

রা। না-ভেবে। যদি জানতে চাও, কেউ কি বুঝবে।… ছবি মানে শুধু ছবি।… রবীন্দ্রনাথ বলতেন, পরোয়া করি না। আমি পরোয়া করি না। আমার যেমন মনে হয়েছে, আমি তেমনই এঁকেছি। আমি চাই না যে আপনি তা বুঝুন। আপনার যা মনে হয় তা-ই ভাবুন।

— কাজ করার সময় সবচেয়ে বেশি আনন্দ কবে পেয়েছেন?

রা। সব সময়ে। সব… সব সময়ে। (মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে) ছোটবেলা থেকে সব সময়ে।

— আপনি সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন?

রা। খেয়াল।… যখন যা হাতের কাছে মেলে।

— কাজের বিষয় কি আগেই ঠিক করে নেন? কী ভাবে এগোন?

রা। কখনও ঠিক থাকে, কখনও থাকে না।… না-ভেবে… শুধু অনুভব করি আর কাজ করে যাই। আপনা-আপনিই চলে আসে… নিজের থেকে।

— কোন কাজ কি কখনও এতটাই সম্পূর্ণ হয় যে পরে আর তাতে নতুন কিছু জোড়া বা বাদ দেওয়ার দরকার পড়ে না?

রা। না। একেবারে শেষ কখনওই হয় না। ওতে আবার কাজ করি… করতেই থাকি। ক্লান্ত হয়ে পড়লে হয়তো ছেড়ে দিই।… নতুন ভাবনা এলে… ছেড়ে দিই।… অসন্তুষ্টি থেকেই যায়। যত ক্ষণ আকাশ শূন্য… তত ক্ষণই সন্তুষ্টি।… নয়তো (ছবি) বদলাতেই থাকে। আবার করো… শেষ করে যাও।… তার ওপর আবার করো, করতেই থাকো, তো সম্পূর্ণ বদলে যাবে। আবার করো… আর-একটা করো।

রবীন্দ্রনাথ পাঁচ হাজার কবিতা লিখেছিলেন, পরে আবার ছবি আঁকতে শুরু করলেন। কেন, কেন করলেন?… আবার করলেন।… ইচ্ছেটা থাকেই। এই সবই শিক্ষা দিয়ে গেছেন… তা-ই শিখতে পেরেছি।… আবার একটা করেছি… আগেরটা ছেড়ে দিয়েছি… দ্বিতীয়টা শুরু করেছি।

— কাজ করবার জন্য সবচেয়ে জরুরি কী মনে হয়?

রা। ফিলিং ফর এভরিথিং।… ফিলিং। যদি ফিলিং দুর্বল হয়, তবে শুধুই নিরাশা।… ফিল… ফিল।… ধ্যান ঠিক হলে ফিলিং হবে।

— আজকাল আপনি প্রায়ই অসুস্থ থাকেন, তা-ও ছবি এঁকে চলেছেন, বিশ্রাম করতে ইচ্ছে হয় না?

রা। (ব্যঙ্গ করে) কী করলে বিশ্রাম পাব? (হাসতে-হাসতে) কিছু-না-কিছু তো করতেই হবে… কী করব? গান করব?… গপ্পো করব… সময় খুব কম। সময় কোথায়?… সত্তর বছর পেরিয়ে এসেছি… কোথায় কে জানে সময় চলে গেছে।… না। কাজ। নতুন কাজ। নতুন কথা। লাগাতার নতুন পর্যবেক্ষণ… যদি চোখ খোলা থাকে তো কত জিনিশ সব একসাথে আছে দেখা যায়।

— কখনও কি এমন মনে হয়নি এই শিল্পকাজের বিনিময়ে দেশ তথা সমাজ আপনাকে কী দিল?

রা। (রুক্ষ গলায়) আমি সে রকম ভিখারি নই।… কিচ্ছু চাই না।… আমি সব কিছুই আমার কাজ থেকে পাই।

— শেষ প্রশ্ন, এ রকম আর কত দিন কাজ করে যেতে চান?

রা। যত দিন পারি।… শেষ পর্যন্ত।… যখন কাজ হয়ে যাবে… তখন ধ্যানও শেষ হয়ে যাবে।… তখন… শূন্য… আকাশের সমান।… আকাশ।… অবকাশ।

এই সাক্ষাৎকার ললিতকলা আকাদমি-র হিন্দি জার্নাল ‘সমকালীন কলা’য় (১৯৮৫) প্রথম প্রকাশিত হয়। এই অনুবাদ প্রথম ছাপা হয় ‘চাক্ষুষ’ নামে বিচিত্রবিদ্যার পরিচয়জ্ঞাপক এক পত্রিকার শেষ সংখ্যায় ( নভেম্বর, ১৯৯৩)। তারপর অন্তর্ভুক্ত হয় রামকিঙ্কর-এর লেখাপত্তর ও সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘আমি চাক্ষিক, রূপকার মাত্র’-এ। মূল সাক্ষাৎকারটি ১৯৭৭-এর অক্টোবরে নিয়েছিলেন জওয়াহর গোয়ল, ভাষান্তর করেছেন অলকানন্দা সেনগুপ্ত।

(এখানে প্রকাশিত লেখাপত্র শুধুই পড়ার জন্য। দয়া করে এর কোন অংশ কোথাও পুনর্মুদ্রণ করবেন না। ইচ্ছে করলে লিঙ্ক শেয়ার করতে পারেন, কিন্তু অনুরোধ, গোটা লেখাটি কখনওই অন্য কোন ওয়েবসাইটে বা কোন সোশ্যাল নেটওয়রকিং সাইটে শেয়ার করবেন না। ধন্যবাদ।)

Leave a Reply