‘ছিন্নমূল’ই আমায় ছিন্নমূল করেছে : নিমাই ঘোষ

আমার বায়োস্কোপ দেখা শুরু ১৯২২ সালে কর্নওয়ালিশ থিয়েটারে। তখন আমার বয়স মাত্র আট বছর। ঐ সময় থেকেই আমি ক্রমাগত ছবি দেখছি। কন্টিনেন্ট বা আমেরিকা থেকে যে-সব ছবি আসত, তার বেশির ভাগই দেখতাম। চার্লি চ্যাপলিনের কোন ছবিই বাদ পড়ত না। সে সময় ছবি দেখতে নিয়ে যেতেন আমার ছোট পিসেমশাই। এর পর ঢাকায় দাদুর কাছে চলে যাই। দাদু-দিদিমাও ছবি দেখতে আপত্তি করতেন না। তবে দাদু বলতেন ছবি দেখতে গেলে তাঁর সঙ্গেই যেতে হবে। আর তাঁর সঙ্গে যাওয়া মানেই ক্লাসিক সাহিত্যের ওপর ছবি, যেমন লা মিজারেবল, থ্রি মাসকেটিয়ার্স, মন্টি ক্রিস্টো প্রভৃতি দেখতে যাওয়া। অবশ্য আমি অন্য ছবিও দেখতাম।

সে সময়ে সিনেমা সম্বন্ধে আমার এত উৎসাহ ছিল যে রিয়্যাল ফটোগ্রাফি বলে যে-সিনেমা কার্ড আসত আমি তা সংগ্রহ করতাম। ১৯২৭ থেকে সংগৃহীত সেই সব কার্ড আমার এখনও আছে। তা ছাড়া আমার দুটো স্ক্র্যাপবুক ছিল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে ছবি এবং সে সম্পর্কে অন্যান্য ডিটেলস যোগাড় করে তাতে রাখতাম। একটা ছিল বিদেশী, অন্যটা ভারতীয়। বিদেশীটা মানিকবাবুকে দিয়েছিলাম আর ভারতীয়টা কোথায় হারিয়ে গেছে। এককথায় সে সময়ে সিনেমা সম্বন্ধে পাগল ছিলাম। তখনকার স্টারদের সমস্ত ইনডেক্স— কার কত হাইট, কার ক্যাটস আই, কার ব্ল্যাক আই— এ সব আমার নখদর্পণে ছিল।

সেই বয়সে অনেকের ফিল্মে নামার, হিরো হবার যে-গোপন বাসনা থাকে, আমারও সেটা ছিল। চলায়-বলায় অঙ্গভঙ্গিতে তখনকার হিরোদের নকল করতাম। এবং ঐ মানসিকতা থেকেই একবার দেওয়ালের খাঁজ ধরে দোতলায় উঠে গিয়েছিলাম। কিন্তু একসময় উপলব্ধি করলাম যে আমার দৈহিক গঠন আমার নায়ক হওয়ার পথে অন্তরায় হবে। কিন্তু ফিল্ম আমার রক্তের মধ্যে ছিল। I couldn’t think of myself without film. আমি ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো গল্প বলতে পারতাম। তখন থেকেই সংকল্প করলাম যে ডিরেক্টর হব এবং ছবির মধ্য দিয়ে গল্প বলব।

আমার দিদিমা বলতেন, যে-কাজই করো, পড়াশোনায় ফাঁকি দেবে না। তাই এ বিষয়ে আমি সজাগ ছিলাম। আমি প্রচুর লিটারেচার পড়তাম, ক্রমে ফিল্ম সম্বন্ধে পড়াশোনা শুরু করলাম। টাইম ম্যাগাজিনে তখন ফিল্ম সম্বন্ধে নানারকম তথ্য থাকত, সেগুলি আমি সংগ্রহ করতাম। যখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি তখনই ফটোগ্রাফি শুরু করে দিই। আমার মামারা স্টিল ফটোগ্রাফি করতেন, তাদের ল্যাবরেটরিতেই আমি প্রোসেসিং ও প্রিন্টিং শিখি। সেই সঙ্গে ফটোগ্রাফি সম্বন্ধে গভীরভাবে পড়াশোনা শুরু করলাম। বর্তমানে আমি ফটো-অপটিকস ও ফটোকেমিস্ট্রির এক্সামিনার।

উনিশশো একত্রিশে আমি কলকাতায় ফিরে আসি। এখানে আসার পর আমার বাবা আমাকে চারুপ্রকাশ ঘোষেদের ফার্মে রেডিয়ো ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য ঢোকান। কিন্তু ওয়ারলেস সেটের পেছনে তারের জট দেখে বললাম, এই যদি ওয়ারলেস হয় তবে আমার দরকার নেই। রেডিয়ো ইঞ্জিনিয়ার হওয়া হল না। ফিল্মই তখন আমার মাথায় ঘুরছে।

চারুদা আমার পিসতুতো ভাই। সেই সময় চারুদা শখের বশে ক্যামেরা কিনল এবং ল্যাবরেটরি করল। সেই সময় পি সি বড়ুয়া অপরাধী ছবিতে প্রথম কৃত্রিম আলো ব্যবহার করেন। সেই দেখে আমরা কৃত্রিম আলোয় ছবি তোলা শুরু করলাম। ক্রমে স্টিল ফটোগ্রাফির ওপর দখল এসে গেল।

চারুদা ব্রিটিশ অ্যালমানাক অফ ফটোগ্রাফিক জার্নাল সাবসক্রাইব করত। সেই সব পত্রিকা পড়ে আমি ঠিক করলাম যে ইনফ্রা-রেড প্লেটে ছবি তুলব। যখন ফিল্ম কিনতে যাই তখন হাউটন বুচারের সাহেব আমায় বলেছিল, I was first in India to import in infra-red plate. সেই ফিল্ম দিয়ে আমি ট্রিক ফটোগ্রাফি করেছিলাম।

সেই সময়ে শম্ভু সিং নামে একজন শিখ ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি ছিলেন অরোরা ফিল্মসের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। তাঁকে আমার ইচ্ছার কথা বলাতে তিনি আমায় নিরুৎসাহ করে বলেছিলেন যে ফিল্ম লাইনে ভীষণ কষ্ট স্বীকার করতে হবে কারণ কেউ কিছু শেখাতে চায় না, তারপর ভীষণ অপমানজনক ব্যবহার করে। আমি তাঁকে বললাম, শত কষ্ট স্বীকার করতে হলেও আমি ফিল্মে যাব।

আমার বাবার কিন্তু সিনেমায় যাওয়ার ব্যাপারে ঘোর আপত্তি ছিল— তাঁর মতে ফিল্ম লাইনে গেলে চরিত্র থাকে না। The old man was 100% correct but he was not correct about me. যাই হোক বাবার অমতেই উনিশশো বত্রিশে ফিল্ম লাইনে গেলাম।

শম্ভুবাবু প্রথমে আমায় কোন কোম্পানিতে না-দিয়ে ক্যামেরাম্যান বিভূতি দাসের অধীনে কাজ করতে বললেন। উনি তখন বড়ুয়া পিকচার্সের স্টুডিয়োতে উর্দু ছবি আহ্‌ মজনু মা’তে কাজ করছিলেন। আমি হলাম তাঁর সেকেন্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট। ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন সুকুমার দাশগুপ্ত, যিনি পরে ডিরেক্টর হয়েছিলেন। তখনকার দিনে অ্যাসিস্ট্যান্টদের কাজ ছিল ক্যামেরা নড়াচড়া করানো, লেন্স আনা— এই সব। ডেব্রি জে কে মডেল ক্যামেরায় আমি কাজ শুরু করি।

বিভূতিবাবু কাজ ভালোই করতেন, কিন্তু থিয়োরেটিকাল নলেজ একেবারে ছিল না। আমার অবশ্য দরকার ছিল হাতেনাতে কাজ শেখা, কারণ থিয়োরেটিকাল দিকটা নিয়ে আমি নিজেই চর্চা করতাম। কিন্তু হলে হবে কী, তখনকার দিনে বেশির ভাগ ক্যামেরাম্যানই কাউকে কিছু শেখাত না। গানের ঘরানার মতোই যাবার সময় প্রিয় শিষ্যকে কিছু দিয়ে যেত। তবে বিভূতিবাবু লোক হিশেবে ভালো ছিলেন, কোনদিন খারাপ ব্যবহার করেননি।

ছবি শেষ হওয়ার পর শম্ভুবাবু আমায় অরোরায় ঢুকিয়ে দিলেন। দেবীবাবু সেই সময় অরোরার টেকনিকাল অ্যাডভাইসর। উনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ক্যামেরাম্যানদের একজন। মেকানিকাল ও সায়েন্টিফিক ব্যাপারে উনি খুব পণ্ডিত ছিলেন। উনি আমাকে অনেক থিয়োরেটিকাল ও টেকনিকাল প্রশ্ন করতেন এবং আমার জবাব শুনে আমাকে অরোরার চিফ ক্যামেরাম্যান অশোক সেনের অধীনে কাজ দিলেন। এই অশোক সেন মানুষটা ছিলেন অদ্ভত। একসময় তিনি ভাইসরয়ের মিলিটারি সেক্রেটারির সেক্রেটারি ছিলেন। ভদ্রলোক আর্টিস্টও ছিলেন এবং সম্ভবত ঐ টানেই ঐ চাকরি ছেড়ে ফিল্ম করতে এলেন। ওঁর একটা দোষ ছিল যে উনি বেসামাল অবস্থাতেই স্টুডিয়োতে আসতেন। আমি কাজ বুঝি দেখে উনি আমায় লাইটিং করার সুযোগ দিলেন এই শর্তে যে যখন কর্তারা কেউ আসবে তখন আমায় ফ্লোর ছেড়ে দিতে হবে। অশোকদা ক্যামেরা অপারেট করতেন আর ফলো ফোকাস করতাম আমি। উনি আমাকে বলতেন যেখানে লাইটিং করবে সেখানে মার্কা দিয়ে রাখবে, তাতে পরের দিনে কাজের সুবিধা হবে। এর অবশ্য অন্য একটা উদ্দেশ্যও ছিল— কোন কর্তা যখন আসতেন তখন ঐ মার্কা ধরে উনি লাইটিং করতেন। আমাদের মধ্যে এই বোঝাপড়া ছিল। আমি বরাবরই ওঁর ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম। উনি আমায় মহানিশা ছবির বর্মায় আউটডোরের অনেক কাজ স্বাধীনভাবে করতে দিয়েছিলেন।

সে সময় অরোরায় প্রধানত টি সেস বোর্ডের বিজ্ঞাপনের ছবি তোলা হত। সেগুলি পাঁচ-ছয় রিলের হত এবং অনেক সময় স্টারদের পযন্ত ভাড়া করা হত। ঐরকম একটা ছবিতে অচ্ছুতকন্যা’র গল্পকার নিরঞ্জন পালের পরিচালনায় কাজ করার সুযোগ এসেছিল। কর্পোরেশনের টিকা নাও ধরনের প্রচারমূলক ছবিও ওখানে হত। তা ছাড়া অরোরার সঙ্গে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের অ্যান্টি-টেররিস্ট ছবি করার একটা চুক্তি ছিল। তিন-চার রিলের ছবি হত— ছেলেটা খুব পড়াশোনায় ভালো, উন্নতি করতে পারত কিন্তু টেররিস্টদের পাল্লায় পড়ে গোল্লায় গেল আর যেই ফিরে এল অমনি সে আই সি এস হয়ে উন্নতি করে ফেলল— এই ধরনের সব ছবি আর কী। কী যে কেলেঙ্কারি করেছি। তখন তো এত সব বুঝতাম না। তখন তো মাথাতে একটাই চিন্তা যে কীভাবে ক্যামেরাম্যান হব। এখন ভাবলে মরমে মরে যাই।

সেই সময় আমি অরোরা থেকে কোন পয়সাকড়ি পেতাম না, ফলে খুব অসুবিধা হচ্ছিল। সেটা জগদীশবাবুকে বলাতে উনি আমায় জানালেন, তোমার চান্স আসছে। সেই সময় চিফ গার্ল গাইড লেডি বেডেনপাওয়েল কলকাতায় এসেছিলেন, গভর্নমেন্ট অরোরাকে গার্ল গাইড জাম্বরি কভার করতে বলল। এদিকে অশোকদা তখন সিমলায়। তখন অশোকদার জায়গায় দেবীবাবু আমার নাম প্রস্তাব করলেন। অনাদিবাবু আমার বয়স অত্যন্ত কম বলে প্রথমে আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু আমার প্রতি দেবীবাবুর আস্থা দেখে অবশেষে মেনে নিলেন।

আমার নিজের অবশ্য একটু আপত্তি ছিল, কারণ একজন ডকুমেন্টারি ক্যামেরাম্যানের অন্তত ছ’ফুট লম্বা হওয়া উচিত, কিন্তু আমার মাত্র ৪ ফুট ৯ ইঞ্চি। কিন্তু আমার আপত্তি টিকল না। দু’জন হেল্পার নিয়ে টুলে উঠে-উঠে খুব অসুবিধা করে ছবি তুলতে লাগলাম। তখন টকির ক্যামেরায় মোটর ছিল, কিন্তু বাইরে ছবি তুলতে গেলে হ্যান্ডক্র্যাঙ্ক ক্যামেরা ব্যবহার করতে হত। একটা হাত তাতে একেবারে মেকানিকালি ঘুরিয়ে যেতে হত। ছবিটা ওঠার পর আমিই ছবিটি প্রোসেস, প্রিন্ট ও এডিট করলাম। অনাদিবাবু আমাকে সমস্ত ডিপার্টমেন্টে হাতেনাতে কাজের সুযোগ দিয়েছিলেন, ফলে একমাত্র সাউন্ড ছাড়া সমস্ত ডিপার্টমেন্টের কাজ আমি জানতাম। একমাত্র সাউন্ডটা আমার মাথায় ঢুকত না এবং এখনও বুঝি না। তখনকার দিনে এই সুযোগ পাওয়াটা কম কথা নয়।

ছবি হয়ে গেলে রাইটার্স বিল্ডিঙের সাহেবরা প্রোজেকশন দেখে ফটোগ্রাফির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল। আমার মনে আছে ওরা যখন জিজ্ঞাসা করল, Who is the cameraman— অনাদিবাবু বলেছিলেন, He is not a man yet, he is a young boy.

এর পর আমি অহীন্দ্র চৌধুরীর পরিচালনায় তেলেগু ছবি বিপ্রনারায়ণ-এ সুযোগ পাই। সেই খবর সিমলায় চলে যায় এবং অশোকদা ছুটে আসেন। তখন ঠিক হয় আমি হব বিপ্রনারায়ণ-এর সেকেন্ড ইউনিট ক্যামেরাম্যান। সেটা হবে ১৯৩৩ সাল। দক্ষিণ ভারতীয় ছবির শ্যুটিং তখন কলকাতা ও কোলাপুরে হত। পুরো ইউনিট ঐখান থেকে আসত, শুধুমাত্র ডিরেক্টর ও ক্যামেরাম্যান এখান থেকে নেওয়া হত। ঐ ছবিতেই আমি পরবর্তী কালের বিখ্যাত অভিনেত্রী কাঞ্চনমালার স্ক্রিন টেস্ট নিই। অনাদিবাবু যখন স্ক্রিন টেস্ট নিতে বলেছিলেন, তখন আমি বলেছিলাম যে মেয়েটি খুব সুন্দরী। শুনে অনাদিবাবু বলেছিলেন, আমি তোমার চোখের টেস্ট চাইনি, ক্যামেরার টেস্ট চেয়েছি। তোমার বয়স এখন অনেক কম।

এর কিছু দিন পরেই শ্রমিক-মালিক বিরোধে মালিকপক্ষের সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় আমি অরোরা ছেড়ে দিই। এই ছেড়ে দেবার কিছু দিন পরেই আমি প্লুরিসিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ি এবং ডাক্তার ফিল্মের কঠোর পরিশ্রমের কাজ এড়াবার পরামর্শ দেন। ১৯৩৯ নাগাদ একটু সুস্থ হলে আমি ও আমার ভাই আসানসোলে রেডিয়োর ব্যবসা খুলি। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় রেডিয়ো সেট আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হয়। আমার অবস্থা তখন ‘খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল তার এঁড়ে গরু কিনে।’ যা-ই হোক, আবার তাঁত ফিরে পেতে ফিল্ম লাইনে যাবার চেষ্টা শুরু করলাম। ১৯৪৪ নাগাদ আমি রাধা ফিল্মে জয়েন করলাম। তবে ওদের ফর্মালিটি মেনটেন করার জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে ঢুকতে হল, যদিও আমায় কাউকে অ্যাসিস্ট করতে হত না। তখন ধীরেন দে ওখানে ডিপার্টমেন্টের হেড। আমি ওখানে প্রতিমা, ঘরোয়া প্রভৃতি ছবিতে ক্যামেরার কাজ করি। ১৯৪৮ নাগাদ আমি

ফ্রি-ল্যান্সার হয়ে যাই। সেই সময় আমি ছবি বিশ্বাস পরিচালিত যার যেথা ঘর ছবিতে কাজ করি।

তখন স্টুডিয়োর কাছে হবে বলে বালিগঞ্জে বাসা ভাড়া করে থাকি। মানিকবাবুও তখন বালিগঞ্জের বাসিন্দা। পাড়াপড়শি হিশেবে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়, তবে কীভাবে আলাপ তা আর আজ মনে নেই। আমার মতোই ফিল্মকে ভালোবাসেন দেখে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। তিনিই ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির কথা আমায় বলেন এবং ফিল্ম মুভমেন্টে আমার আসা মানিকবাবুর জন্যই।

ঐ প্রায় একই সময়ে আমি চারুদার মাধ্যমে আই পি টি এ’তে যোগদান করি। এবং সত্যি কথা বলতে কী, গণনাট্যের সঙ্গে যুক্ত না-হলে ছিন্নমূল করার কথাই আমার মাথায় আসত না।

এপারের মানুষ হলেও আমার জীবনের ফর্ম্যাটিভ পিরিয়ড পূর্ববঙ্গে কেটেছে। যখন দেখলাম যে যাদের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি তারা রাস্তায় পথেঘাটে পড়ে মারা যাচ্ছে, তখন আমার মনের ভেতরটা নাড়া দিয়ে উঠল। সেই সময়ে আমি ভেবেছিলাম এই বিষয়ে আমি একটা ডকুমেন্টারি তুলব। কিন্তু আমার বন্ধুরা বলল যে তোমার ডকুমেন্টারি কে দেখবে, তার চেয়ে একটা গল্পের মধ্য দিয়ে বিষয়টাকে দেখাও। তখনকার খুব শক্তিশালী লেখক স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য আমার খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তাঁকে অনুরোধ করাতে তিনি একটি গল্প লিখে দিতে রাজি হলেন। আমি তাঁকে কয়েকটা পয়েন্টস দিয়েছিলাম যাতে তা গল্পে স্থান পায়।

গল্পটা পাওয়ার পর প্রযোজক পেতে অসুবিধা হয়নি। শ্যামল দে বলে একজন ফিল্মে প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজ করত, তাকে আমি আমার ইচ্ছার কথা বলেছিলাম। সে-ই আমাকে তার ভাই বিমল দে’র সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়। বিমল দে ছিলেন কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির আইডিয়োলজিকাল টিচার। গল্পটা ওনার মনের ওপর বেশ একটা ছাপ ফেলেছিল। বিমল দে’র এক বন্ধু সাহাও এই ছবিতে টাকা দিয়েছিলেন। ওঁরা দু’জনই পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল হয়ে এপারে চলে আসেন।

ছিন্নমূল-এর চিত্রনাট্য আমিই করি। চিত্রনাট্যটি মানিকবাবুকে পড়ে শোনাই। শুনে তিনি প্রশংসা করেন ও আমাকে উৎসাহ দেন। চিত্রশিল্পী হিশেবে খ্যাত মানিকবাবু তখনও ফিল্মজগতে প্রবেশ করেননি, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির কোন মোড়লের মতামতের চাইতে তাঁর মতামত আমার অনেক সহায়ক হবে বলে মনে হয়েছিল। কারণ ছিন্নমূল-এর প্রকাশভঙ্গি গতানুগতিক পথ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন পথের সন্ধানে এগোচ্ছিল।

ছিন্নমূল-এর শ্যুটিং শুরু হওয়ার কিছু দিন পরই হোম ডিপার্টমেন্টের আপত্তির ফলে শ্যুটিং বন্ধ করে দিতে হল। ট্রেনের ভেতর ক্যামেরা কনসিল করে কাজ করার সময়ে এক পুলিশপুঙ্গব দেখল যে জানলা দিয়ে একটা নল বেরচ্ছে আর ঢুকছে। আমার সহকারী ছিল পাঠানদের মতো দেখতে। এতে তার ধারণা হল এরা স্পাইং করছে এবং ব্যাপারটা রেলের জি এম পযন্ত গড়াল। জি এম ছিলেন মিস্টার লাল। তিনি বললেন, দেখো, আমারও দেশ ভাগ হয়েছে। তুমি একটা মহৎ কাজ করছ। আমি তোমাকে সবরকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কিন্তু যেহেতু এটার রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে, তাই তোমাকে হোম ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা অনুমতি আনতে হবে।

তখন প্রযোজককে নিয়ে আমি হোম ডিপার্টমেন্টে গেলাম। তখন পি কে সেন পুলিশ কমিশনর। তিনি সব শুনে বললেন, ঠিক আছে, স্ক্রিপ্টটা জমা দিয়ে যান। কিছু দিন পরে ওরা জানালেন যে এটা হাইলি কম্যুনাল এবং অনুমতি পাওয়া যাবে না। আমি ওদের কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না যে এটা নন-কম্যুনাল। তখন আমি একটা চাল খেললাম এবং বললাম— মশাই, ঢের হয়েছে, আমার আর ফিল্ম করার দরকার নেই। আমার প্রোডিউসারের কিছু পয়সা নষ্ট হল। আমার স্ক্রিপ্টটা ফেরৎ দিয়ে দিন। যাই হোক, তখন ওরা সেটা ফেরৎ দিয়ে দিল।

এর পর আমি আবার শ্যুটিং শুরু করলাম, তবে এবার আরও লুকিয়ে। সেই সময় রেলওয়ের লোয়ার গ্রেড কিছু অফিসার আমায় খুব সাহায্য করেছিল। তারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল যে যদি কেউ আসে তো তারা আগেভাগেই সাবধান করে দেবে। শিয়ালদহ স্টেশনের ওপাশে ট্রেজারির ছাদ থেকে ট্রেন আসার একটি দৃক্ষ্মশ্য তুলতে তারা আমাকে খুব সাহায্য করেছিল।

তারপর সেন্সরের ছাড়পত্রও খুব একটা সহজে পাওয়া যায়নি। বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। সেই সময়ে সেন্সরে হোম ডিপার্টমেন্টের একজন প্রতিনিধি থাকত। চেয়্যারম্যান ছিলেন বি এন সরকার। তিনি খুব স্ট্রং স্ট্যান্ড নিয়েছিলেন। না-হলে অনেক মূল্যবান ডকুমেন্টারি শটস কাটা পড়ত। তবু কিছুটা কাটছাঁট করে ছাড়পত্র পাওয়া গিয়েছিল।

ছবিটা কিন্তু এখানে আশানুরূপ চলেনি। তবে না-চললেও পুদভকিন যখন রাশিয়ান কালচারাল ডেলিগেশনের সদস্য হিশেবে কলকাতায় এসে ছবিটি দেখেন, তখন ছবিটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। ছিন্নমূল ছবির বাস্তবতাই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁরই সুপারিশে সোভেক্সপোর্ট ফিল্ম সোভিয়েত রাশিয়ার জন্য ছবিটির চিত্রস্বত্ব ক্রয় করে। এতে প্রযোজকের লোকসানের বোঝা অনেক কমে যায়।

এর পর সোভিয়েত রাশিয়ায় ভারত থেকে প্রথম যে-কালচারাল ডেলিগেশন যায়, আমি তার সদস্য হয়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় যাই। সেখানে তখনকার কয়েকজন বিখ্যাত চিত্র-পরিচালকের সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্য হয়েছিল— যাঁদের মধ্যে ছিলেন দবঝেঙ্কো, আলেকজান্দ্রভ, পাইবিয়েভ, জেরাসিমভ প্রভৃতি। কারওর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ হয়নি। তবে সত্যিকারের শিল্পী যে কত বিনয়ী হয়, দবঝেঙ্কার সঙ্গে এক ভোজসভায় ক্ষণিকের আলাপেই তার পরিচয় পেয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে যে-কথাবার্তা হয়েছিল তার একটা সারাংশ তুলে ধরছি।

আমি : আপনার মতো গুরুস্থানীয় শিল্পীর এত কাছে আসার সুযোগ পাওয়ার নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। আপনাদের কাছে আমাদের মতো চলচ্চিত্রকর্মীর অনেক কিছু শেখার আছে।

দবঝেঙ্কা : আমি বুঝতে পারছি, আপনি খুবই বিনয়ী। আমরা আপনার চাইতে বয়সে বড়, সুতরাং আমাদের অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি থেকে হয়তো অনেক জিনিশ নেবার বা শেখার থাকতে পারে। ঠিক তেমনই আপনারা আপনাদের যৌবনের অভিজ্ঞতা এবং আবেগে নিজেদের প্রকাশ করার জন্যে যে-সব প্রয়াস ও ভঙ্গির নিদর্শন দেখাচ্ছেন তা থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার থাকে। শিল্প সব সময় দুটো জেনারেশনের ভাবের আদানপ্রদানে উন্নত হতে থাকে।

দবঝেঙ্কার প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুয়ে পড়ে।

রাশিয়াতে একটা মজার ব্যাপার বলি। ওখানে আমাদের দেখাশোনার জন্য যে-সব ভলান্টিয়ার ছিল, ছিন্নমূল দেখার পর তাদের ধারণা হয়েছিল যে Director is six-footer and silverhaired. কিন্তু দেখার পর তারা আমায় বলেছিল, On both counts, we have been disappointed.রাশিয়ায় থাকাকালীন ওরা আমার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিল যেটা লিটারারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। এর জন্য আমি ৭০০ রুবল পেয়েছিলাম।

রাশিয়া থেকে ফিরে এসে সমস্যা দেখা দিল। কাজ পাচ্ছিলাম না। যাঁরা কথা দিয়েছিলেন, তাঁরাও পিছিয়ে গেলেন। সম্ভবত ছিন্নমূল করা ও রাশিয়ায় যাওয়ার ফলে আমার সম্বন্ধে যে-ধারণা হয়েছিল, তার জন্যই আমার নামের সঙ্গে কেউ নাম জড়াতে রাজি হচ্ছিল না। সেই সময়ে বাড়ির অমতে বিয়ে করে আমি বাড়িছাড়া। I had to sustain myself. ঐ অবস্থাতেই আমি মাদ্রাজে যাওয়া স্থির করলাম, সেটা হবে ১৯৫২ সাল। যাবার জন্য আমার একটা কিয়েভ ক্যামেরা ছিল, সেটা বিক্রি করে দিতে হয়।

ওখানে যাওয়ার পর তখনকার প্রখ্যাত পরিচালক আর এস মানি ও তানির তানির-খ্যাত বালচন্দরের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবি করি। বালচন্দরের প্রথম ছবিই আমার সঙ্গে।

সে সময় কলকাতা থেকে পাঁচু চৌধুরী, কমল ঘোষ ও শৈলেন বোসও মাদ্রাজে গিয়েছিলেন। তাঁরা কিন্তু স্থানীয় ভাষা শেখেননি। সাধারণ কর্মীদের থেকেও তাঁরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতেন। আমি কিন্তু প্রথম থেকেই লাইটবয়, সেট-কুলিদের মতো সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে মিশতাম, গল্পগুজব করতাম। যার জন্য আমি ওদের খুব আপন হয়ে গিয়েছিলাম। ওরা আমাকে খুব সহযোগিতা করত, যা এর আগে অন্য কোন অ-দক্ষিণ ভারতীয় পায়নি। অনেক প্রোডিউসরই আমায় এ কথা বলেছে। ওরাই আমায় তামিল শিখিয়েছে। লেখাপড়া-করা লোকজন আমায় তামিল শেখায়নি, বরং ভুল তামিল বললে তারা বলত তুমি তামিলকে খুন করছ। আর ওয়র্কাররা বলত, ভুল হয় হোক, আমরা ঠিক করে দেব। ফলে হয়েছে কী, ওয়র্কারদের চলতি তামিল শিখেছি, শুদ্ধ তামিল বলতে পারি না। তাই এখন ওরা আমায় তামিল পড়তে বলছে।

ইতিমধ্যে একটা ঘটনা আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে ভালোবাসা পেলে ওয়র্কারদের সহযোগিতা কোন্‌ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। যখন আমি প্রথম যাই তখন বহিরাগত বলে ইজ্জতের ভয়ে প্রোডিউসররা টাকা একদম বাকি রাখত না, কিন্তু ক্রমে যখন ঘরের লোক হয়ে পড়লাম, তখন টাকা বাকি পড়তে লাগল। একবার একজন নতুন প্রোডিউসর তিন মাস টাকা বাকি ফেলে দিল। যখন আমি তাকে বললাম যে how my pot will boil?— সে বলল, দেখো, there is a priority স্টারদের ডেট না-পেলে ছবি শেষ হবে না, তাই যা পাচ্ছি তা-ই ওদের দিয়ে দিতে হচ্ছে। তখন আমি ঠিক করলাম যে বড়-বড় স্টারদের নিয়ে একটা কম্বাইনড শটের দিন আমি যাব না। ওরা তখন মানি বলে একজন, যে আমার ক্ল্যাশ কলগুলো করত, তাকে কিছু না-জানিয়ে ডেকে পাঠাল। মানি ফ্লোরে এলে লাইটবয়রা নেমে এসে তাকে সব জানিয়ে কাজ করতে বারণ করল। সে-ও সব শুনে কাজ করতে অস্বীকার করল ও শ্যুটিং বাতিল হল। একমাত্র তখনই প্রোডিউসর আমার পাওনা টাকা মিটিয়ে দিল।

আমি দেখলাম যে একজন লোককে শুধুমাত্র ভালোবেসে যদি ওয়র্কাররা এতটা করতে পারে, তাহলে সংগঠিত হলে এরা কী করবে! আমি তখন ঠিক করলাম যে আমার টাকার দরকার নেই— আমি ট্রেড ইউনিয়ন করব। তখন মোহন কুমারমঙ্গলম ওখানে ট্রেড ইউনিয়ন করত। ও আমাকে উৎসাহ দিল। ওখানে তখন একটা সিনে টেকনিসিয়ানস অ্যাসোসিয়েশন ছিল। কল্পনা’র ক্যামেরাম্যান ওটা করেছিল, কিন্তু ওটা সোসাইটিস অ্যাক্টে রেজিস্টার্ড ছিল। ওরা ট্রেড ইউনিয়ন করতে ভয় পেত। আমি বললাম যে এটা ট্রেড ইউনিয়নে কনভার্ট করো। ’৫৭-য় আমি সিনে টেকনিসিয়ানস গ্কি তৈরি করলাম। আমি ছিলাম ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট।

এটা হওয়ার পরই সেন্ট্রাল গর্ভনমেন্ট ফিল্ম কাট করল, ফলে বহু টেকনিসিয়ানের বেকার হবার সম্ভাবনা দেখা দিল। তখন আমি একটা প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত করি, যাতে প্রায় দেড় লক্ষ লোক যোগ দিয়েছিল। ডি এমকে’র এম জি রামচন্দ্রন ও কংগ্রেসের শিবাজী গণেশন তখন টপ স্টার এবং পরস্পরের রাইভ্যাল। প্রথমে ওরা মিছিলে আসতে চায়নি। তখন ওদের রাইভ্যালরিটা আমি খুব সাকসেসফুলি কাজে লাগাই এবং দু’জনেই মিছিলে আসে। ঐ মিছিলে যোগদানের উৎসাহ শেষে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে শান্তিভঙ্গের সম্ভাবনায় উৎকণ্ঠিত পুলিশ কমিশনারের অনুরোধে আমি অ্যাকট্রেসদের মিছিলে যোগ দিতে নিষেধ করি।

আমি ১২ বছর সিনে গ্কিের প্রেসিডেন্ট ছিলাম। এটা যে ভালোবেসে করেছিল তা নয়, মনোভাবটা ছিল ঝড় যা বয় ওর ওপর দিয়েই যাক। তারপর সিনে গ্কি ভেঙে ১৫ টা ক্র্যাফটস ইউনিয়ন করা হল। ক্যামেরাম্যানের সমস্যা যে ক্যামেরাম্যানই বোঝে, মেক-আপ ম্যান বোঝে না এবং তাই আলাদা ক্র্যাফটস ইউনিয়ন প্রয়োজন— এটা বোঝাতে আমাকে খুব বেগ পেতে হয়েছিল। স্বার্থানেষী মহল সেই সময় আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছিল। এই ইউনিয়নগুলিকে একত্রিত করে যে-ফেডারেশন গঠন করা হল, তারও আমি দু’বছর প্রেসিডেন্ট ছিলাম। বর্তমানে আমি সরে দাঁড়িয়েছি এবং একমাত্র সংকটের সময়েই ওরা আমাকে ডাকে।

মাদ্রাজে আমি প্রথম ছবি করি ১৯৬০ সালে। মাদ্রাজে যাবার পর থেকেই আমার কাছে ছবি পরিচালনার অফার এসেছিল। কিন্তু আমি ওদের বলেছিলাম যে আগে তোমাদের ভাষা শিখতে দাও, তোমাদের একজন হতে দাও, তখনই ছবি করব, তা না-হলে সেই ছবিতে মাটির গন্ধ পাবে না। প্রথম ছবিটা করার পেছনে একটা ঘটনা আছে। আমার সঙ্গে একই বাসায় একটি ছেলে থাকত। তার গান-বাজনায় খুব ন্যাক ছিল এবং তার ছবির সঙ্গীত-পরিচালক হবার একটা বাসনা ছিল। সে এবং তার স্ত্রী আমাকে বারবার একটা সুযোগ করে দেবার জন্য পীড়াপীড়ি করত। ওরা বুঝত না যে একজন ক্যামেরা-ম্যানের পক্ষে এই ধরনের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব নয়। আমি তখন ওকে বললাম যে একটাই রাস্তা আছে যদি একজন ছবির প্রোডিউসর যোগাড় করতে পারো এবং সেই ছবি পরিচালনার ভার আমায় দাও, তাহলে তোমার সেই ছবির সঙ্গীত-পরিচালক হবার পথে কোন বাধা থাকবে না। ছেলেটি সি পি আই-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেখানে তার কিছু বন্ধু ছিল, তারা ৪৮ জন মিলে পাঁচ হাজার টাকা করে দিতে রাজি হল। তবে এই শর্তে যে ছবির থিম প্রোগ্রেসিভ হতে হবে। তখন আমি পাদেই তেরিউদু পার (এই দেখো পথ) ছবিটি করি। মধ্যবিত্ত ও মিল-কর্মীদের ওপর এই ছবিটিতেও আমি ছিন্নমূল-এর মতো কোন মেক-আপ ব্যবহার করিনি, তবে ওদের পীড়াপীড়িতে নায়িকাকে আকর্ষণীয় করার জন্য একটু মেক-আপ ব্যবহার করতে হয়েছিল। একমাত্র সহস্রনামম ও সুব্বিয়া বলে আমার দুই বন্ধু ছাড়া আমি কোন পেশাদার অভিনেতা ব্যবহার করিনি। ওঁরা দু’জনেই খুব চমকপ্রদ অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি তামিল ভাষায় প্রথম বাস্তববাদী ছবি বলে পত্রপত্রিকায় প্রশংসিত হয় এবং শ্রেষ্ঠ তামিল ছবি হিশেবে ১৯৬১’তে রাষ্ট্রপতির পুরস্কার পায়। এ ভি এম ছবিটির পরিবেশনা নিয়েছিল। তা-ও কিন্তু ছবিটা ভালো চলেনি। অবশ্য সোভিয়েত রাশিয়া ছবিটা কিনেছিল এবং সেই বাবদ ৯০-৯৫ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল।

এর পর আমি কুষ্ঠরোগীদের ওপর লাইট এ ক্যান্ডেল নামে একটা ডকুমেন্টারি করি।

১৯৬৮ সাল নাগাদ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং বেশ কিছু দিন ফিচার ফিল্মের কাজ বন্ধ রাখতে হয়। সেই সময় বিজ্ঞাপনের ছবি করে আমায় পেট চালাতে হয়।

এর পর আমি কর্ণাটকে বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাম্‌স গীতে। ১৯৭৬ সালে রঙিন ফটোগ্রাফির জন্য কর্ণাটক সরকারের প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ পুরস্কারটি পাই। ছবিটির পরিচালক ছিলেন সে বছরের রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত আদি শঙ্করাচার্য’র জি ভি আয়ার। কারাভালি ছবিটির ক্যামেরার কাজও উচ্চপ্রশংসিত হয়। তারপর মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একটা ডকুমেন্টারি ছবি নির্মাণ করি।

আমার তৃতীয় ফিচার ফিল্ম সুরাভালি অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়। তামিলনাড়ু উপকূলের মৎস্যজীবীরা ছবিটির বিষয়বস্তু। স্টেজের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবিতে ব্যবহার করা হয়। ছবিটি এন এফ ডি সি প্রোডিউস করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর এই ছবিটি যেখানে তোলা হয়েছিল, ছবিটি রিলিজ করার পূর্বেই সেখানে দাঙ্গা হয় এবং সম্ভবত সেই কারণেই ছবিটি তামিলনাড়ু সরকারের সাবসিডি অ্যাওয়ার্ড পায়।

বর্তমানে আমি ক্যামেরার কাজ করা ছাড়াও ফিল্ম সোসাইটির কাজে ব্যস্ত আছি। এই মুহূর্তে নতুন কোন ছবি নির্মাণের পরিকল্পনা আমার নেই।

প্রথম প্রকাশ : চিত্রভাষ , জানুয়ারি ১৯৮৭, অনুলিখন : নন্দন মিত্র
পরে অন্তর্ভুক্ত হয় নিমাই ঘোষ-এর লেখাপত্র ও সাক্ষাৎকারের একমাত্র সংকলন ‘ছিন্নমূল এবং’-এ।

(এখানে প্রকাশিত লেখাপত্র শুধুই পড়ার জন্য। দয়া করে এর কোন অংশ কোথাও পুনর্মুদ্রণ করবেন না। ইচ্ছে করলে লিঙ্ক শেয়ার করতে পারেন, কিন্তু অনুরোধ, গোটা লেখাটি কখনওই অন্য কোন ওয়েবসাইটে বা কোন সোশ্যাল নেটওয়রকিং সাইটে শেয়ার করবেন না। ধন্যবাদ।)

Leave a Reply