থিও-কে লেখা চিঠি : ভিনসেন্ট ভান গখ

স্যাঁ রেমি, ৪ জানুয়ারি ১৮৯০

প্রিয় ভাইটি,

চিঠির জন্য ধন্যবাদ তোমায়। যদিও মাত্র গতকালই একটা চিঠি তোমায় লিখেছি, তবু এর উত্তর এখনই দিয়ে নিই।

শেষ ক্যানভাসগুলোর মতো এত শান্ত মনে আর কখনও আমি কাজ করিনি, যার কয়েকটা তুমি এই চিঠির সঙ্গে একই সময়ে পাবে বলে আশা করি।

এই মুহূর্তে আমি হতাশায় অবসন্ন, কিন্তু যেহেতু সাম্প্রতিক এই আক্রমণের ধাক্কা এক সপ্তাহের মধ্যেই কেটে গেছে, তখন তা আবার ফিরে আসার আশঙ্কা করে লাভ কী? আর তা-ও যখন তুমি জানো না বা আগাম দেখতে পাচ্ছ না যে, তা কী ভাবে বা কোন্ রূপে।

ফলে যত দিন সম্ভব কাজ করে যাও, ভাবো যে কিছুই হয়নি। শীতটা একটু কমলে বাইরে বেরনোর সুযোগ পাব, তখন যে-কাজগুলো এখানে শুরু করেছিলাম, সে সব শেষ করার দিকেই বরং মন দেব।

প্রভঁস অঞ্চলের একটা ধারণা দেওয়ার জন্য সাইপ্রেস আর পাহাড় নিয়ে আরও কয়েকটা কাজ করতে হবে।

‘গিরিখাত’ আর সামনে রাস্তা-সহ পাহাড়ের ক্যানভাসটা যার যথার্থ নমুনা।

বিশেষত ‘গিরিখাত’, শুকোয়নি বলে কাজটা আমার কাছেই রয়েছে। পাইনগাছ-সমেত পার্ক-এর ছবিটাও তা-ই। পাইন বা সাইপ্রেস গাছের চরিত্র বুঝতেই আমার সমস্ত সময় চলে যায়, বাতাস এখানে পরিষ্কার, রেখাগুলো পালটায় না, প্রতি পদক্ষেপেই তা ফের খুঁজে পাওয়া যায়।

ঠিক কথা যে, গত বছর অসুখটা বার বার ফিরে এসেছিল, কিন্তু এ-ও ঠিক যে কাজ করেই অল্পে-অল্পে আমি স্বাভাবিকতায় ফিরেছি। এ বারও সম্ভবত তা-ই হবে। ফলে ভাবো যে কিছুই হয়নি, কারণ এ ব্যাপারে তো সত্যি আমাদের করারও কিছু নেই।

আমার দুর্ভাগা সঙ্গীসাথীদের মতো নিজেকে যদি একই অবস্থায় পড়তে দিই, তবে সেটা যে আরও খারাপ হবে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সারা দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর— ওরা কিছুই করে না। এ কথা তো তোমায় বলেছি বহু বার, ম. সালে-কেও বলেছি, জোর দিয়ে বলেছি, এ পাগলখানায় যেন কখনও কাউকে পাঠানো না-হয়।

আমার কাজটুকু অন্তত আমার মনের স্বচ্ছতা খানিকটা ধরে রাখে, আর তাতেই এর হাত থেকে রেহাই মেলার একটা সম্ভাবনাও থাকে।

এই মুহূর্তে কয়েকটা ছবি আমার মাথায় পাকিয়ে উঠেছে, আগের থেকেই সেই জায়গাগুলো দেখতে পাচ্ছি, যে-সব জায়গায় আগামী দিনে আমি কাজ করতে চাই। কেন আমি আমার অভিব্যক্তির ধরন পালটাতে যাব?

এখান থেকে বেরলে, ধরে নেওয়া যাক যে বেরব, তার পর আমার ক্যানভাসগুলো নিয়ে কী করা যায়, সেটা খতিয়ে দেখা যাবে। কিছু ছবি আছে আমার, কিছু অন্যের, হয়তো সে সব নিয়ে একটু বিক্রিবাটার কথাও তখন ভাবা যাবে।

এখনও জানি না, কিন্তু আরও কিছু কাজ এখানে না-করতে পারার কোন কারণ নেই, আর বেরনোর পর সেগুলো তো আমার লাগবে। আবারও বলি, আগাম কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, কোন ভরসাই পাচ্ছি না, কিন্তু এটা তো সত্যি যে অনির্দিষ্ট কালের জন্য এখানে আমি থেকে যেতে পারি না। তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই তা বলে, হঠাৎ কিছু করার নেই, তার চেয়ে বরং এখানে থাকার দিনগুলো যে-ভাবে চলছে, চলুক।

গতকাল মার্সেই-তে দুটো ক্যানভাস পাঠিয়েছি। রুল্যাঁ, আমার বন্ধু, ওকেই পাঠিয়েছি উপহার হিশেবে। অলিভ গাছের মধ্যে একটা শাদা বাড়ি, আর লাইলাক-রঙা পাহাড় ও কালো একটা গাছের পটভূমিতে গমক্ষেতের ছবি। বড় ক্যানভাস যেটা তোমায় পাঠিয়েছিলাম, অনেকটা তার মতো। ম. সালে-কেও একটা ছোট ক্যানভাস দিয়েছি, কালো পটভূমিতে লাল আর গোলাপি কিছু জেরানিয়ম ফুলের ছবি, প্যারিসে এ রকম কয়েকটা ছবি আমি এঁকেছিলাম।

টাকা যা পাঠিয়েছ, তার মধ্যে ১০ গেছে ম. পেরঁ-র ধার মেটাতে, গত মাসে নিয়েছিলাম। ২০ ফ্রাঁ খরচ করেছি নববর্ষের উপহার কিনতে, ছবি পাঠানো আর অন্যান্য খাতে গেল ১০, আর হাতে আছে ১০।

এই মুহূর্তে এখানকার একটা ছেলের পোট্রের্ট করছি, ছবিটা সে তার মা-কে পাঠাতে চায়। তার মানে আমি আবার কাজ শুরু করেছি, আপত্তিকর হলে ম. পেরঁ নিশ্চয়ই আমাকে তা করতে দিতেন না। তিনি আমায় বলেছেন, ‘আশা করা যাক যে অসুখটা আর হবে না’— একই কথা, বরাবরের মতো, খুব সুন্দর করে বলেন তিনি। তাঁর দিক থেকে তো আর আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু যেহেতু এর কোন দ্রুত উপশম নেই, ধরে নেওয়া যাক যে সময় আর পরিস্থিতিই সব ঠিক করে দেবে।

ফের আর্ল-এ যেতে চাই, এক্ষুনি নয়, ধরো ফেব্রুয়ারির শেষে। প্রথমে তো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে সেখানে, যা আমায় সর্বদা প্রাণিত করে, তারপর এ-ও দেখার যে, প্যারিসে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া আমার পক্ষে ঠিক হবে কি না।

তোমার কাছে বোন এসে থাকায় খুব খুশি হয়েছি। জো এবং তাকে আমার শুভেচ্ছা, তোমার-আমার জন্য বলি যে, দুশ্চিন্তা কোর না। যত যা-ই হোক, গত বছরের মতো অসুখটা তো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, ফলে আশা করতে পারি যে ধীরে-ধীরে তা সেরে যাবে।

ঠিক আছে, ভালো থেকো, উষ্ণ করমর্দন।

চিরকালের তোমার,
ভিনসেন্ট

মনফকিরা প্রকাশিত ‘এ ভাবেই চলে যেতে চাই : ভিনসেন্ট ভান গখ-এর শেষ সাত মাসের চিঠি’ (১ জানুয়ারি-২৩ জুলাই ১৮৯০) থেকে। সংকলন ও ভাষান্তর : সন্দীপন ভট্টাচার্য, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০০৮।

(এখানে প্রকাশিত লেখাপত্র শুধুই পড়ার জন্য। দয়া করে এর কোন অংশ কোথাও পুনর্মুদ্রণ করবেন না। ইচ্ছে করলে লিঙ্ক শেয়ার করতে পারেন, কিন্তু অনুরোধ, গোটা লেখাটি কখনওই অন্য কোন ওয়েবসাইটে বা কোন সোশ্যাল নেটওয়রকিং সাইটে শেয়ার করবেন না। ধন্যবাদ।)

Leave a Reply