বীতশোক ভট্টাচার্য: ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’র অংশ

সিন্ধু সভ্যতার উৎখনন করে প্রত্নভারতের শিল্পবস্তু যে পাওয়া গিয়েছে রবীন্দ্র-নাথ সে বিষয়ে অবহিত ছিলেন। মহেঞ্জোদড়োর উল্লেখ আছে তাঁর কবিতায়। ইসলামের আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত হিন্দু বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্ম ভারত-শিল্পের প্রধান প্রেরণা ছিল। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে ধর্মীয় ও ধর্ম-অনপেক্ষ উপাদানের প্রভাবের তৌলন আলোচনার প্রয়োজন আছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে মিথ বা পুরাণকে ধর্মীয় অনুষঙ্গ থেকে বিচ্যুত করে শিল্পিত উপকরণরূপে ব্যবহারের কাব্য ও নাট্যগত নমুনা আছে, তাঁর ছবিতে ধর্মীয় প্রেরণার অভিঘাত বোধ হয় সে নিরিখে বিচারের বিষয় নয়। সৃষ্টি ও ধ্বংসের প্রতীক শিব রবীন্দ্র-নাথের নান্দনিক ভাবনায় সম্ভবত সব থেকে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছেন। সাহিত্যসৃষ্টিতে শারীরিকতার উল্লেখে রবীন্দ্রনাথ প্রায়শ সংকুচিত, লিঙ্গ বা ফ্যালিক পিলারের অনুরূপতায় নারীমুখ অংকনের মোটিফটি স্বাভাবিক অথচ বৈপ্লবিক বোধ হয়। যৌন প্রেমের দিব্য প্রেরণা এবং শরীরী মিলনের ফলে আত্মিক উত্তরণের ব্রাহ্মণ্য বিশ্বাস তাঁর ছবির মূলে কার্যকর এক শক্তি হতে পারে। আধুনিক কবি ও কথাসাহিত্যিক ডি. এচ. লরেন্সের দুঃসাহসী এবং নিষিদ্ধ চিত্রমালার পাশে এ জাতীয় ছবি স্থান করে নিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ অঙ্কিত যৌন প্রতীকের গূঢ় মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও সম্ভব। হিন্দু মন্দিরের স্থাপত্যের মধ্যে মিথুন ভাস্কর্যের অবস্থান রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন, নারী পুরুষের নগ্নতা ও মৈথুন তাঁর ছবিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারেনি, কিন্তু তরুণ ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনারকের মৈথুন-
দৃশ্য সম্পর্কে উদার ও সুন্দর উল্লেখ রবীন্দ্রনাথ মুছে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি। মাটি পাথরের মন্দিরচূড়া, তোরণ শিখর, মণ্ডপ ও গর্ভগৃহ তাঁকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু তাঁর রচনায় গোপুরম ইত্যাদি দক্ষিণী মন্দিরের অনুষঙ্গ সেভাবে কার্যকর নয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় শিল্প ভারতে— এশিয়ায় ছড়িয়ে আছে। রবীন্দ্ররচনায় স্তূপের স্মৃতি দুর্লভ নয়। নন্দলালের আঁকা অজন্তা চিত্রের অনুকৃতি বিষয়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কটু মন্তব্য করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘য়ুরোপীয় গুণীমণ্ডলীর মধ্যে এমন কেউ নেই যে বলে না যে ঐ অজন্তার ছবি শ্রেষ্ঠ আদর্শের ছবি, তাদের মধ্যে এমন বেওকুফ কেউ নেই যে ঐ অজন্তার ছবির ওপর কেবল দাগা বুলিয়ে যাওয়াকেই শিল্পসাধনার চরম বলে মানে।’ পাশ্চাত্য ওরিএন্টালিজমএর যে ফাঁদ পেতেছিল উপনিবেশের মানুষ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে তার জাল কেটে বেরোনো সম্ভব ছিল না। অবশ্য এ বিষয়ে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সহজ সতর্কবার্তা ছিল। রবীন্দ্রনাথ যে অজন্তা চিত্রাবলি গ্রন্থে অঙ্কিত দেখেছিলেন সে সব চিত্রমালায় জাপানি পেলবতার ভেজাল ছিল। অবনীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে জাপানি শিল্পের ওয়াশ-পদ্ধতি মিশ্রিত প্রয়োগ যেমন নতুন শিল্পশৈলী রচনা করে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বেলায় সে ধরনের নতুনত্ব নেই, আসলে সর্বসারগ্রাহী শিল্পী বলতে যা বোঝায় রবীন্দ্রনাথ তা ছিলেন না। শিবের মতো বুদ্ধ মূর্তিও তাঁর প্রিয়, কিন্তু গ্রিক প্রভাবিত গান্ধার শিল্পের কঙ্কালসার বুদ্ধ কল্পনা তাঁর মনঃপূত হয়নি। অমিয় চক্রবর্তী বামিয়ান বুদ্ধ দেখেছিলেন, শ্রীলংকায় বিরাট বুদ্ধমূর্তিও তাঁর চোখে পড়েছে, কিন্তু তাঁর বুদ্ধমূর্তি কল্পনায়  বিশালতার চেয়ে প্রসন্নতা সৌকুমার্য ও করুণার ভাবটিই তাঁর প্রিয় ছিল। বুদ্ধের ভূস্পর্শ বরাভয় প্রভৃতি বাঙ্ময় মুদ্রা এবং পদ্মাসনে উপবেশনের ভঙ্গিটিও তাঁর প্রিয় ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের শরীরী অঙ্কনে হস্ত সঞ্চালন ও মুদ্রা রচনার কোনো ভূমিকা নেই। জাপানে জেন বৌদ্ধমঠে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছেন, জেন কবি বাশোর কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন, জাপানি জেন ছবি এবং জাপানে রক্ষিত চিনে জেন শিল্পী মুকির ছবিও তিনি সম্ভবত দেখেছিলেন। জাপানি ছবির নান্দনিক সংযম তাঁকে অভিভূত করেছিল। জেন ছবি আঁকায় যে ধ্যান আত্মপরীক্ষা ও অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োগের তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সুফলের পরিচয় আছে তা রবীন্দ্রনাথকে ভাবিয়েছিল এমন অনুমান বোধ হয় একেবারে অসঙ্গত হবে না। বৌদ্ধশিল্পের সরলতাও হয়তো রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল। সারল্য রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু ছবির লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।

মনফকিরা প্রকাশিত ‘অগ্রন্থিত বীতশোক’ (বীতশোক ভট্টাচার্য-এর অগ্রন্থিত গদ্যের সংকলন ১) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ প্রবন্ধের অংশ

Leave a Reply