শিল্প সমাজ ব্যক্তি : নিখিল বিশ্বাস

মানুষ তার নিজের তাগিদেই সমাজ গড়ে তুলেছে। সে ও সমাজ, এই সন্ধির মধ্যেই তার চলমান জীবন কিংবা আর-এক জীবন, যা তার সূক্ষ্ম অনুভূতিতে প্রবাহিত—সেই জীবনবোধের বিভিন্ন দিককে প্রকাশ করেছে কত বিচিত্র সব কল্পনায়। যে-যুগে ইতিহাস ছিল না, সে যুগেও সমাজ বা ব্যক্তির পরিপ্রেক্ষিতে আদিম মানুষের মনের কত তির্যক-সরল অনুভূতি আমাদের নাড়া দেয়। যদিও দেখা যায় যে, সমাজচিন্তা সে যুগে যথেষ্ট পরিমাণে আধুনিকতার আওতায় বেড়ে না-উঠলেও এ কথা সর্বদাই স্বীকৃত হবে যে আদিম মানুষের শিল্পরীতিতে শিল্পীর ব্যক্তিত্ব সমাজ-সাধারণের ঊর্ধ্বে বিশেষ ভাবে পরিলক্ষিত। সমাজ তার প্রয়োজনের মধ্যেই বেঁচে থাকবার আত্মিক সংহতি-সংগ্রহের অনুকূলে জীবন-সংগ্রামের কঠিন রূপ শিল্পরীতিতে প্রকাশ করেছিল। শিল্প সমাজজীবনের মুকুর, যদিচ শুধুমাত্র সমাজজীবনের মোটা অর্থকেই শিল্প উপজীব্য করে না, সেখানে চেতনায় যে বোধের বিদ্যুৎপ্রবাহ আমাদের অভিষিক্ত করে, সেই উপলব্ধিগত সত্য সমাজের চলমান জীবনের মধ্যেই শিল্পী আর-এক নতুন অর্থে উপস্থাপিত করে। সেখানে সমাজের ঊর্ধ্বে শিল্পের স্থান। এক হিসাবে শিল্পী সমাজের অঙ্গ এবং সেই হিসাবেই শিল্পী আবেগহীন এক অন্য সত্তা, যার সঙ্গে সমাজের দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহের স্থূল দিকের কোনই সম্পর্ক নেই। এক অর্থে শিল্প সমাজাশ্রয়ী এবং অন্য অর্থে শিল্পীর আবেগবর্জিত অনুধ্যান সমাজের গতিভঙ্গিমার নির্দেশক। আদিম সমাজ ও আধুনিক সমাজের অন্তর্বর্তীকালীন বিরাট সময়প্রবাহে সমাজ ও ব্যক্তির যে-সম্বন্ধ বিভিন্ন সময়ে লক্ষিত হয়, তার কত যে ভাববৈচিত্র্যে আমরা অভিষিক্ত হই। আধুনিক শিল্পকলায় মূল্যায়ন করার পথে সেই বিচিত্রের অনুশীলন এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বাধীন চিন্তা ও সমাজাশ্রয়ী চিন্তার মধ্যে মিল ও সংঘাত, এই দুই-ই বিশেষ ভাবে প্রয়োজনীয়। শিল্পীরা সমাজ-ছাড়া নয় কিংবা পুরোপুরি সামাজিক ক্রিয়াকল্পের কারিগরও নয়। শিল্পীর কাজ ব্যবহারিক তাগিদে প্রকাশের প্রয়োজনীয় কর্মতৎপরতা অপেক্ষা অনেক গভীরে নিহিত—সেখানে সেই ব্যক্তি-শিল্পীর সঙ্গে সমাজের বন্ধন বর্তমানের এক বিচিত্র ও বিশেষ সমস্যা।

এ কথা মানতেই হবে, যে-সময়ে সমাজের পুরোধা রাজারা বা প্রতিপত্তি-শালী ব্যক্তিবর্গ শিল্পের পৃষ্ঠপোষক অর্থনৈতিক কারণবশত, তখন শিল্পীও সেই সমাজের রীতিনীতিকে তথাকথিত নৈতিক চেতনার আওতায় রূপ দিতে বাধ্য হয়েছে। কথাটির প্রয়োগ কটু লাগতে পারে, কিন্তু ইতিহাস-পরিস্রুত অনু-শীলনে ঐ সামাজিক অনুশাসনের মধ্যে বাধ্যবাধকতাই যে প্রধান ছিল, তা বুঝতে কিছু মাত্র কষ্ট হয় না। ক্লাসিক শিল্পকলা মানুষের বহু বছরের সাধনলব্ধ ফল। ক্লাসিক শিল্পসাধনায় মানুষের ঐকান্তিক কামনার জিনিশ—মানসিকতার বহির্মুখী স্বাধীন চিন্তার আশ্বাস। এই আশ্বাস থাকলেও ধর্মের প্রচণ্ড কর্মকাণ্ড শিল্পের মানদণ্ড হিসাবেই সমাজে নিজের ভূমিকা নিয়েছিল। ক্রমশ তথাকথিত নৈতিক কঠোরতা শুচিবায়ুগ্রস্ততার সমারোহে সেই পোষকতা শিল্পী মেনে নিয়েছিল। খ্রিস্টীয় শিল্পী সাধনার প্রথম যুগে শুধুমাত্র ধর্মার্থে শিল্পের সাধনা, তার অপটু দৈন্যকেও মেনে নিয়েছিল। তুলনায় অভিজাত্যবিলাসী রোমান কিংবা গ্রিক শিল্প চাতুর্য ব্যক্তিত্ববিকাশকারী। ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থায় রাজা কিংবা ধর্ম বিশেষ প্রভাবশালী, সেই কারণে শিল্পবৃত্তিধারী শিল্পীর ব্যক্তিত্ব রাজানুগ্রহ কিংবা ধর্মানুগ্রহ ব্যতীত সুদূরপরাহত ছিল। এ কথা বলার এই উদ্দেশ্য নয় যে ভারতবর্ষে ক্লাসিক কিংবা মধ্যযুগে শিল্পসাধনায় দীনতা ছিল। ধর্মের সংস্কার মানুষের সমগ্র জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। সেই প্রভাব তার বোধের মর্মস্থল পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল। এর বাইরে কোন স্বচিন্তার প্রভাব সম্ভব নয় এবং সম্ভব হলেও প্রকাশিতব্য ছিল না। কিন্তু তবুও সেই প্রভাবশালী ধর্মার্থে সাধিত শিল্পচেতনার আওতা ডিঙিয়ে শিল্পীর অব্যক্ত ভাষা আমাদের মনকে নাড়া দেয়। কোন-কোন শিল্পীর সেই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস সমস্ত প্রভাব, সমস্ত ক্ষমতা তুচ্ছ করে তার ব্যক্তিত্বের প্রতিভাত করেছে। তবে এর সংখ্যা নগণ্য। তবুও বাবতে বিস্ময় লাগে, যখন দেখা যায় যে জীবন-দর্শনের মূল আমার মনের মর্মস্থলে ধর্মের অবিচ্ছেদ্য সংস্কারগুলি সমেত গ্রথিত, আজন্মলালিত জীবনধর্মের মধ্যেই চিন্তার যা-কিছু স্ফুরণ, এই গণ্ডির মধ্যেই নিজের ব্যক্তিত্ব সমাজহিতে ব্যয়িত। তবে ক্ষোভের বিষয় নিশ্চয়ই, যখন দেখা যাবে, প্রতিপত্তিশালীদের হিতই সামাজিক হিত। ব্যক্তি ও সমাজের এই স্তরে শিল্পীর লালিত জীবনাদর্শের মধ্যেই মহান শিল্পচিন্তা শ্রদ্ধেয়। জীবনধর্মে স্রোত একমুখী ছিল, আর সেই একমুখী চিন্তার বাইরে অন্য চিন্তা দুস্তর, অন্যায়। সমাজতান্ত্রিক শক্তির অপচয় শুরু হবার সঙ্গে-সঙ্গে সমাজে যে-দলটির প্রভাব দেখা গেল, তাদের আর যা-ই না-থাক, আর্থিক কৌলীন্য ছিল। এই কুলীনরা প্রথম যুগে নির্বিচারে মেনে নিয়েছে, পূর্বতনদের কালচার, কিন্তয পরে-পরে আর্থিক কৌলীন্যের জোর অন্য সমস্তদের সব কিছু একচেটিয়া করে নেবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিল। জিতলও সহজে। কারণটা অনুমেয়। ক্লাসিক যুগে কিংবা পরবর্তী যুগে রাজারা কিংবা ধর্ম শিল্পচেতনা লালিত করলেও যে-জীবনাদর্শে শিল্পীরা অভ্যস্ত ছিলেন, সেই একই জীবনাদর্শে প্রতিপত্তিশালীরাও দীক্ষিত ছিল। কালচার কিংবা সদাচারের মূলটি সমভাগে শিল্পী এবং পৃষ্ঠপোষক উভয়েরই মধ্যে বিভক্ত ছিল। সর্বপ্রকার অনুশাসন এবং স্বচেতনার পথে প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিত্ব সব ক্ষেত্রে লৌহনিগড়ে শৃঙ্খলিত ছিল না। কিন্তু আর্থিক কৌলীন্যে অভিমানীদের আর যা-ই থাক, সদাচারের লেশমাত্র নেই। তাই ব্যক্তি ও সমাজ সম্বন্ধীয় যে-সংস্কার পূর্বতনদের নিয়ন্ত্রিত করত, সেই সংস্কার বর্তমানের এক জটিল সমস্যা। ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিকতার যুগে ব্যক্তি এবং সমাজ, এই দুয়ের এক বিশেষ সম্বন্ধ শিল্পীদের ব্যক্তিত্বে বিশ্বাসী করেছিল। অনুশাসন এবং শাসন, এই দুয়ের বন্ধন তখন নতুন অর্থবণ্টনের পটভূমিতে শিথিলপ্রায়— বর্তমানের কুলীনরাও তখন অগ্রগামী দল—তাই শিল্পে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস-নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তি-সচেতনতা বিশেষ ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। সম্বন্ধটা ছিল কালচার আর অর্থের বিনিময়সূত্রে। কিন্তু অর্থের সম্বন্ধটা পরে এত প্রকট হল যে, কালচার না-জানা কুলীনরা শিল্পের ধারক হয়ে দাঁড়াতে বর্তমানে ব্যক্তি এবং সমাজসম্বন্ধে বিশেষ ভাবে জটিল হয়ে পড়েছে।

ক্লাসিক যুগে সমাজের কর্ণধাররা সক্রিয়ভাবেই অনুশাসনের আওতায় শিল্পীদের এনে ফেলত। কিন্তু এ যুগে পোষকতার অন্তরালে স্বার্থবুদ্ধি যূথবদ্ধতায় ব্যক্তিত্ববিলোপে অগ্রসর। এই আত্মবিলোপ সন্ত্রাসকর। বিমূর্ত শিল্পকলা এক অর্থে যূথবদ্ধতার বিরুদ্ধাচরণ এবং অন্য অর্থে, বোধ হয় সামাজিক অর্থে ব্যক্তিত্ব বিলোপকারী। প্রথম অর্থে বিমূর্ত শিল্প শিল্পীর আত্মজিজ্ঞাসার বিপ্লবময় অন্বেষণ, কিন্তু অন্য অর্থে বিমূর্তবাদিতায় ব্যক্তিত্ব ক্রমশ বিলুপ্তপ্রায়। যদি বলি যে, ব্যক্তিত্ব অপেক্ষা শিল্পকলার স্থায়িত্ব শ্রেষ্ঠ—কিন্তু সে ধরনের শ্রেষ্ঠ চিত্রকলার স্থায়িত্ব বেদনাদায়ক। আগের কালে স্বাক্ষরিত চিত্রকলা না-থাকলেও ব্যক্তিত্ব সেখানে সম্পূর্ণ ভাবে বিলুপ্ত—এটা যুক্তির খাতিরেও মানতে পারি না। সে জন্য এটা স্বীকৃত যে ব্যক্তিত্বের আমেজটুকু থাকে বলেই এত বিচিত্র অন্বেষণ। বিচিত্রতা মানবমনের এক পরম ধন। তাকে যূথবদ্ধতার অজগর-পেষণে দলাইমলাই করলে অত্যাধুনিক, অ-ব্যক্তিত্বশালী চিত্রকলার স্থান হবে, কিন্তু মহৎ শিল্পের অপমৃত্যু ঘটবে। ছবি যদি ঘর সাজাবার উপকরণ মাত্র হয়, যেমন দরজা-জানলার পর্দা, তা হলে এই ভালো। ডিজাইনের অতিরিক্ততা ছাড়া ছবিতে আর কিছু থাকার দরকার নেই। কিন্তু ছবিতে যদি অপরিমিত আত্মজিজ্ঞাসার পথ খুঁজতে চাই, আর যদি ছবিতে আত্মবিশ্বাসের দাবি না-থাকে, তবে কষ্টকর কঠিন রেখাবন্ধনী ছাড়া আর কিছুই হবে না। যন্ত্র আমাদের যেমন দিয়েছে অনেক, তেমনই কেড়ে নিয়েছে আরও অনেক কিছু। আমরা অতিরিক্ত পরিমাণে যন্ত্র-উদ্ভূত মানসিকতায় খুইয়ে বসেছি, কিংবা খোয়াতে বাধ্য হয়েছি নিজেদের ব্যক্তিত্ব বলে খুবই প্রয়োজনীয় মূলধনকে। এটা বলার পেছনে যে বলা আমার উদ্দেশ্য নয় যে বিমূর্তবাদ কেবল নীরস বুদ্ধির খেলা, কিংবা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এক মানবমনের প্রতিধ্বনি মাত্র। সমাজ শিল্পের প্রতিধ্বনি কিংবা শিল্প সমাজের প্রতিধ্বনি—উভয় দিক থেকে দেখলে এইটিই প্রতিভাত হয় যে শিল্পীও যান্ত্রিক যুথবদ্ধতার পথে এক অনির্দেশ্য নিয়মে অবচেতনায় একই বুদ্ধির চক্রে বুদ্ধিবাদী। কিন্তু বিমূর্তবাদে যেখানেই ব্যক্তি-শিল্পীর আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি সচেতন, সেখানে বুদ্ধিবাদিতার ঊর্ধ্বে কোমল অনুভূতিতে আমরা অতিষিক্ত হই। পড়েছিলাম, কোন এক শিল্পী যন্ত্র আবিষ্কার করে ফুল-নারীর সৌন্দর্যের একটা স্ট্যাম্প তৈরি করে যাবেন, যাতে করে মানুষের সৌন্দর্য-উপলব্ধির পথে কোন অসুবিধা না-হয়। তাতে করে আর যা-ইহোক, শিল্পকলা কথাটির অপপ্রয়োগ হত মাত্র। কারখানা আর স্টুডিও একই পথে চলত। বুদ্ধিদীপ্ত বিমূর্ত শিল্পকলা যত দিন ব্যক্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছে, তত দিনই বিমূর্ত শিল্পকলা অনন্যসাধারণ হয়ে উঠেছিল। যূথবদ্ধতা শিল্পকলা সাময়িক ভাবে যুগে-যুগে মেনে নিলেও ব্যক্তি-শিল্পী বিপ্লব সেখানে করেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক যুগে শিল্পীরা যে বিপ্লবী, তা স্বীকার করতেই হবে। নিছক তর্কের খাতিরে নয়, সমগ্র সমাজচিন্তার মাধ্যমেও। বর্তমানের যূথবদ্ধতা শিল্পে প্রতিফলিত হলেও বিমূর্তবাদ অন্বেষণ মাত্র এবং শিল্পচেতনার ক্ষেত্রে এই যূথবদ্ধ চেতনাই সত্য নয়। হয়তো বা সামাজিক চিন্তার এই যূথবদ্ধতার হাত থেকে রেহাই দেবে নব শিল্পচিন্তা, নতুন শিল্পবিপ্লব।

নিখিল বিশ্বাস-এর শিল্প-বিষয়ক লেখাপত্রের একমাত্র সংকলন মনফকিরা প্রকাশিত ‘শিল্পের চোখ’ থেকে।

(এখানে প্রকাশিত লেখাপত্র শুধুই পড়ার জন্য। দয়া করে এর কোন অংশ কোথাও পুনর্মুদ্রণ করবেন না। ইচ্ছে করলে লিঙ্ক শেয়ার করতে পারেন, কিন্তু অনুরোধ, গোটা লেখাটি কখনওই অন্য কোন ওয়েবসাইটে বা কোন সোশ্যাল নেটওয়রকিং সাইটে শেয়ার করবেন না। ধন্যবাদ।)

Leave a Reply